জঙ্গি আস্তানা’য় ছিন্নভিন্ন ২ লাশ

জঙ্গি আস্তানা’য় ছিন্নভিন্ন ২ লাশ

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকায় একটি ‘জঙ্গি আস্তানা’র হদিস পেয়ে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব-৭। র‌্যাবের দাবি, গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টা থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সাড়ে আট ঘণ্টার ওই অভিযানকালে আত্মঘাতী বোমায় নিহত হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) দুই সদস্য। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বাড়ির মালিক যুবদল নেতা মাজহার চৌধুরী ও কেয়ারটেকারকে (তত্ত্বাবধায়ক)। বাড়ির কেয়ারটেকার ‘হক সাহেব’ নামে পরিচিত।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে ঢাকা থেকে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে চৌধুরী ম্যানসনের ভেতরে ঢুকে কয়েকটি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করেন। পরে গ্রেনেডগুলো পাশের ধানক্ষেতে নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করেন তাঁরা। র‌্যাব জানায়, বাড়ির বাইরে থেকে দুটি এবং ভেতর থেকে তিনটি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া উদ্ধার করা হয় একটি অত্যাধুনিক একে-২২ রাইফেল, তিনটি বিদেশি পিস্তল, বোমা তৈরির বেশ কিছু সরঞ্জাম, জিহাদি তথ্যসংবলিত চারটি বই, কয়েকটি ছুরি ও দুই জঙ্গির ছিন্নভিন্ন লাশ।

অভিযান শেষে গতকাল দুপুর পৌনে ১২টায় ঘটনাস্থলে সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা গোয়েন্দা তথ্য থেকে জেনেছি, চট্টগ্রাম আদালত ভবনে বড় ধরনের একটি নাশকতার পরিকল্পনা তাদের (জেএমবি) ছিল। মহাসড়কের একেবারে পাশে হওয়ার দরুন পরিবহন যোগাযোগ তাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক। এ জন্যই তারা চৌধুরী ম্যানসন নামের বাড়িটিতে অবস্থান নেয়।’

সেমিপাকা বাড়িটির অবস্থান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে মাত্র ৩০ গজ দূরে।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘গত দুই মাসে সারা দেশে র‌্যাব প্রায় ৩০ জনের মতো জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, জেএমবির একটি গ্রুপ চট্টগ্রামে সক্রিয় আছে। তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদও মজুদ রয়েছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতেই এ অভিযানটি চালানো হয়।’

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযানের প্রারম্ভিক পর্যায়ে র‌্যাবের অবস্থান টের পেয়ে বাড়ির ভেতর থেকে তারা গুলিবর্ষণ করে এবং কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে র‌্যাবও গুলিবর্ষণ করে। সর্বশেষ ভোর ৪টা নাগাদ বাড়ির ভেতর একটি বড় বিস্ফোরণ হয়। এরপর তাদের আর সাড়া-শব্দ পাওয়া যায়নি। বোমা ডিসপোজাল ইউনিট আসার পর জানা যায়, আত্মঘাতী বোমায় দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। তাদের পরিচয় জানা যায়নি। তবে বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর হবে।’

মুফতি মাহমুদ খান আরো বলেন, ‘সোনাপাহাড়ের চৌধুরী ম্যানসন থেকে একে-২২ নামের যে রাইফেলটি উদ্ধার করা হয়েছে ঠিক একই রাইফেল ঢাকার হলি আর্টিজানের ঘটনায় জঙ্গিরা ব্যবহার করেছিল। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, খুব শিগগির এখানকার জঙ্গিরা চট্টগ্রামে নাশকতা সংঘটিত করত।’

এদিকে বাড়ির মালিক মাজহার চৌধুরীর এক ঘনিষ্ঠজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত ২৮ সেপ্টেম্বর সোহেল নামের এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রী, শাশুড়ি ও আরো এক ব্যক্তি থাকবে জানিয়ে বাড়ির মালিকের কাছ থেকে তিনটি কক্ষ ভাড়া নেয়। বাড়ির ভাড়া ধরা হয়েছিল পাঁচ হাজার টাকা। বাড়ির মালিককে সোহেল জানিয়েছিল, পার্শ্ববর্তী বিএসআরএম স্টিল মিলে সে চাকরি করে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে একজন মহিলাও এ বাড়িতে থাকত। তবে কয়েক দিন আগে মহিলাটি অন্যত্র চলে যায়।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য মনির আহম্মদ ভাসানি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে এলাকার যে কাউকে বাড়ি ভাড়া দিতে হলে ভাড়াটিয়ার তথ্য ইউনিয়ন পরিষদের কাছে জমা দিতে হয়। বাড়ির মালিক মাজহার চৌধুরী আমাদের কাছে কোনো রকম তথ্য জমা দেননি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাড়ির মালিক মাজহার বিএনপির সক্রিয় রাজনীতি করেন। তিনি মিরসরাই উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।’

মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থানার এসআই মোহাম্মদ আবেদ আলী গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জানান, সোনাপাহাড়ে র‌্যাবের অভিযানসংক্রান্ত কোনো মামলা জোরারগঞ্জ থানায় দায়ের হয়নি তখনো।

জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকে কয়েক বছর সোনাপাহাড় গ্রামের বাড়ি বাড়ি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে জিহাদের ডাক দিয়ে আসছিলেন জেএমবির আঞ্চলিক কমান্ডার শফিকুল ইসলাম ওরফে জাবেদ। ২০১৪ সাল পর্যন্ত কখনো প্রকাশ্যে কখনো গোপনে রাষ্ট্রবিরোধী ওই কাজে যোগ দিতে গ্রামের বেকার যুবকদের উদ্বুদ্ধ করছিলেন তিনি। মাদরাসা পড়ুয়া কয়েক যুবক তাতে আকৃষ্টও হয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, গ্রামের আবুল বশরের ছেলে রাসেল ওরফে মামুন, সেকান্তর বাদশার ছেলে হেলাল উদ্দিন ওরফে হেলাল, মনু মুন্সির ছেলে হারুনুর রশীদ ওরফে রুবেল, তোফাজ্জল হোসেন দুলালের ছেলে মিনহাজুল ইসলাম সাজিল ওরফে সাজিদ, ছবুর আলীর ছেলে শিবলুসহ বেশ কয়েকজন দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে রুবেল ও শিবলু পলাতক আছে। মামুন ও হেলাল ২০১৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর গাজীপুরে পরিত্যক্ত একটি বাড়িতে ‘নাশকতার প্রস্তুতিকালে’ র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। মিনহাজুল ইসলাম সাজিল ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের নাগরপুর থেকে গ্রেপ্তার হয়। সে কারাগারে রয়েছে। সাজিলও বর্তমানে কারাগারে।

 চৌধুরী ম্যানশনে নিহত ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থানীয় কোনো জঙ্গি সদস্যের যোগসূত্র ছিল কি না, সে বিষয়ে গতকাল স্পষ্ট কিছু বলেননি র‌্যাবের কর্মকর্তারা। তবে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোনাহাড়া এলাকার যে সকল জঙ্গি জেএমবির সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময় নিহত হয়েছে। অনেকে জেলে আছে। আবার দু-একজন পলাতক রয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি মাসেই রিপোর্ট করি।’