শোক আর শ্রদ্ধায় সমাহিত করা হলো নিহত বাবা-ছেলেকে

শোক আর শ্রদ্ধায় সমাহিত করা হলো নিহত বাবা-ছেলেকে


শোক আর শ্রদ্ধায় সমাহিত করা হয়েছে ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত বাবা-ছেলেকে। হামলায় নিহত ৫০ জনের মধ্যে প্রথমে দাফন করা হলো তাদের। তারা হলেন সিরীয় শরণার্থী খালেদ মুস্তাফা (৪৪) ও তার পুত্র হামজা (১৬)। বুধবার জানাজা শেষে ক্রাইস্টচার্চ মেমোরিয়াল পার্ক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে জানাজা ও দাফনের জন্য সাদা কাফনে জড়িয়ে করে তাদের মরদেহ নিয়ে আসা হয়। ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী, সদ্য খোঁড়া কবরে কিবলামুখী করে তাদের চিরশায়িত করা হয়। এর আগে তাদের জানাজায় অংশ নেন কয়েকশ মানুষ। হামলায় নিহত বাকিদের মরদেহ বুধবার হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

২০১৯ সালের ১৫ মার্চ পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, নিউ জিল্যান্ডের দুই মসজিদে গুলি চালিয়ে ৫০ মুসল্লিকে হত্যা করে উগ্র মুসলিমবিদ্বেষী অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট। হামলার আগে অনলাইনে ১৬ হাজার ৫০০ শব্দের একটি ইশতেহারে নৃশংস এ হামলার পেছনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে খুনি ব্রেন্টন ট্যারান্ট। সেখানে উঠে আসে মুসলিমবিদ্বেষ, অভিবাসী বিদ্বেষ ও ‘শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের’ মতো বিষয়গুলো। মুসলমানদের উসমানীয় খিলাফত বা অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তৎকালীন ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের বিজয়ের কথাও উল্লেখ করেছে সে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, লন্ডনের মেয়র সাদিক খনেরও মৃত্যু কামনা করে হামলাকারী। তুরস্ককে খ্রিস্টানদের সবচেয়ে পুরনো শত্রু বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইশতেহারে। এতে ইস্তাম্বুলকে লক্ষ্য করে বলা হয়, আমরা কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান তুরস্ক) আসছি। শহরের প্রতিটি মসজিদ ও মিনার ধ্বংস করবো। হাজিয়া সোফিয়াকে মিনার থেকে মুক্ত করা হবে এবং কনস্টান্টিনোপল আবারো খ্রিস্টানদের দখলে আসবে।’

১৫ মার্চের সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের জানাজায় অংশ নিতে অকল্যান্ড থেকে হাজির হয়েছিলেন গুলশাদ আলী। তিনি বলেন, এটি আমার জন্য খুবই আবেগঘন একটি মুহূর্ত।

এদিন ক্রাইস্টচার্চ মেমোরিয়াল পার্ক কবরস্থান এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। মোতায়েন করা হয় রাইফেল-রিভলভার সজ্জিত পুলিশ সদস্যদের। জানাজায় অংশ নেওয়া মুসল্লিদের অজুর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়।

এদিকে হামলায় নিহত বাকিদের মরদেহ বুধবার স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। এরপর তাদের দাফন সম্পন্ন হবে। এই দাফন নিয়ে মিডিয়ার প্রতি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন কর্মকর্তারা। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের যেন সাংবাদিকরা বিরক্ত না করেন সেই অনুরোধ জানানো হয়েছে।

নিউ জিল্যান্ডের বাসিন্দারা বলছেন, ইতোপূর্বে অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসী হামলার কথা শুনেছেন তারা। কিন্তু ক্রাইস্টচার্চের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ তাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এ হামলার মধ্য দিয়ে নৃশংস এক বর্বরতার স্বাক্ষী হলো তাদের দেশ, বিশ্ব মানচিত্রে যার পরিচিতি ‘শান্তির দেশ’ হিসেবে। এ ঘটনাকে তারা দেখছেন সহিষ্ণুতার অবসান হিসেবে। হামলাকারী অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট এতোটাই বেপরোয়া ছিল যে, তার হাত থেকে এমনকি রক্ষা পায়নি দুই বছরের শিশুও। তবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির বার্তা নিয়ে মসজিদের দরজায় ফুলের তোড়া ও কার্ড নিয়ে হাজির হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শোক আর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন নিহতদের।

মসজিদে রেখে যাওয়া কার্ডগুলোর কোনওটিতে শান্তি ও সহিষ্ণুতার বার্তা। কোনওটিতে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদকে রুখে দেওয়ার বার্তা। কোনওটি আবার ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হিসেবে মেলবন্ধনের।

রাস্তায় চক দিয়ে ভালোবাসার বার্তা লিখেছেন অনেকে। একটি কার্ডে লেখা রয়েছে, ‘খুবই মর্মাহত। আমরা সবাই এমন নই।’ আরেকটি কার্ডে লেখা ‘রুখে দাঁড়াও’। ফুলের তোড়ার সঙ্গে দেওয়া চিরকুটে একজন লিখেছেন, ‘পাশেই আছি। তোমাদের কষ্টগুলো আমাদের সঙ্গে কষ্ট ভাগ করে নাও।’ ক্রাইস্টচার্চের রাস্তায় চক দিয়ে লেখা, ‘ওরা কখনও জিতবে না। ভালোবাসাই বিজয়ী হবে।’
হুইলচেয়ারে ভর করে বাবা ও ভাইয়ের জানাজায় হাজির হয়েছে এই তরুণ

এদিকে শুক্রবারের হামলাকে ‘নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে অন্ধকারতম দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি একাত্মতা জানাতে শুধু কালো পোশাকেই সীমাবদ্ধ থাকেননি জেসিন্ডা, প্রকাশে মাথায় ওড়না জড়িয়ে বার্তা দিয়েছেন সম্প্রীতির। বলেছেন, নিউজিল্যান্ড শুধু তাদেরই যারা এই দেশকে নিরাপদ ভাবেন।

ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে প্রতি শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায় জুমার নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু গত শুক্রবারটি শুধু এ মসজিদের মুসল্লিদের জন্যই নয়, বরং পুরো নিউ জিল্যান্ডের জন্য ছিল এক অন্ধকার দিন। একে একে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে মুসল্লিদের। মসজিদের বাইরে ফেলে রাখা জুতা আর ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।

ক্রাইস্টচার্চের মুসলিম নিউ জিল্যান্ডারদের অনেকেই জন্মগতভাবে অন্য কোনও দেশের মানুষ। এদের একটা বড় অংশের জন্ম আফগানিস্তান, ভারত, সিরিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে। সব ভেদাভেদ ভুলে এই আল নূর মসজিদেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করেন তারা।

 

সৌজন্যে: রয়টার্স, স্টাফ, আল জাজিরা।